বরগুনার আমতলী উপজেলায় ঋণ না পেয়ে দেনার ভয়ে খোকন কাজী (৩৫) নামের এক চা দোকানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
বৃহস্পতিবার পৌনে ২টার সময় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফ্যানের সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনার মর্গে পাঠিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সিটি করপোরেশনের চার নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইয়াছিন কাজীর ছেলে মো. খোকন কাজী ২০১৮ সালে বরগুনার আমতলী আসেন। আমতলী এসে বন্দর প্রাইমারী সড়কের রেভিনিউ মসজিদের একটি স্টল ভাড়া নিয়ে চায়ের দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রায় ৪ বছর পূর্বে বরিশালের পশ্চিম কাউনিয়া এলাকার লাভলু হাওলাদারের মেয়ে ডালিয়াকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করে আমতলী নিয়ে আসেন এবং তারা দোকানের সামনে অবস্থিত সালেহা বেগমের বাসায় ভাড়া থাকতেন।
এর মধ্যে খোকন চায়ের দোকান চালাতে গিয়ে বাকির কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পরেন। একপর্যায়ে তার স্ত্রী ডালিয়া বেগমের ৩ ভরি স্বর্ণ বন্দক রেখে এবং বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে আসছিলেন; কিন্তু ধীরে ধীরে তার ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। দেনা পরিশোধের ভয়ে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন।
বৃহস্পতিবার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তার ঋণ পাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সেখান থেকে ঋণ না পেয়ে তিনি দেনা পরিশোধের ভয়ে হতাশ হয়ে পড়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (নিজের আইডি এমডি খোকন কাজী) ফেসবুকে আত্মহত্যার একটি স্ট্যাটাস দেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি নিজ দোকানের দরজা বন্ধ করে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। দোকানের মধ্যে তার গোঙানির শব্দ পেয়ে স্থানীয়রা দরজা খুলে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখে পুলিশকে খবর দেন পুলিশ এসে তাকে আমতলী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে খোকন লিখেন, ‘সবাই আমাকে মাফ করে দিবেন, আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছি কিছুক্ষণ পরে আমি আত্মহত্যা করব। আমি চারপাশে অনেক ধারদেনা হয়ে গেছি নিজেকে আর সামাল দিতে পারছি না। একটা লোন হওয়ার কথা ছিল সেটাও আজকে হলো না আমি আমার বউয়ের সব গয়নাগাটি টাকাপয়সা খরচ করে পথের ভিখারি হয়ে গেছি। আমার বউ অথবা পৃথিবীর কারো দোষ নেই। আমার এ মৃত্যুর জন্য সকলে আমাকে মাফ করে দেবেন। মা বাবা ভাই বোন সবাই আমাকে মাফ করে দিবেন।’
খোকনের স্ত্রী ডালিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, দেড়টার সময় বাসায় এসে আমার ফোন দিয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলে আবার বেরিয়ে যায়। আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। এটাই আমার সঙ্গে শেষ দেখা। এর কিছুক্ষণ পর শুনি সে আত্মহত্যা করেছে। তবে কি পরিমাণ ঋণ রয়েছে এবং বৃহস্পতিবার কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়ার কথা ছিল তা তিনি জানাতে পারেননি।
রবিউল নামে খোকনের এক বন্ধু জানান, দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটের সময় আমার ফোনে কল দিয়েছিল কিন্তু আমি তখন নামাজে ছিলাম তাই ফোন রিসিভ করতে পারি নাই। নামাজ শেষ করে শুনি খোকন আত্মহত্যা করেছেন। শেষ সময়ে কি বলতে চেয়েছিল তা আর শোনা হয়নি।
খোকনের ভাই মো. মোজাম্মেল কাজী বলেন, ২০১৮ সালে খোকন আমতলী যায়। এর আগে সে বরিশালে টেলারিং কাজ করতো। আমতলী যাওয়ার পর কি কারণে এত দেনা হয়েছে তা আমাদের জানা নেই।
খোকনের মা মমতাজ বেগম কাঁদছিলেন আর বলছিলেন- মোর পোলাডায় এই রহম ক্যা মইরা গ্যালো। টাহা লাগলে মোর সব বেইচ্যা টাহা দেতাম কির লইগ্যা তুই মোগো সব কান্দাইয়া চইল্যা গেলি। কথাগুলো বলছিলেন আর বিলাপ করছিলেন।
এ বিষয়ে আমতলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমির হোসেন সেরনিয়াবাত বলেন, লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনার মর্গে পাঠানো হয়েছে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।